
আকরাম হোসেন,জেলা প্রতিনিধি, বাগেরহাট।দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জেলা বাগেরহাট-এ সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে অনলাইন ক্যাসিনোর আসক্তি। বিশেষ করে মোড়েলগঞ্জ উপজেলা-র পুটিখালী, পঞ্চগড়ন ইউনিয়নে এই প্রবণতা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
মোড়েলগঞ্জ উপজেলার
পুটিখালী ইউনিয়ন-এর ১, ৬,৭, ৮, ৯, নম্বর ওয়ার্ড এবং পঞ্চগড়ন ইউনিয়ন-এর ২,৪, ৫, ৭ নম্বর ওয়ার্ডে তরুণদের একটি বড় অংশ নিয়মিত অনলাইন ক্যাসিনো প্ল্যাটফর্মে যুক্ত রয়েছে।
শুধু খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, বরং অনেকে বিভিন্ন অনলাইন ক্যাসিনো প্রতিষ্ঠানের হয়ে এজেন্ট, মার্কেটিং প্রতিনিধি বা অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্মার্টফোন ও সহজ মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধার কারণে অল্প বয়সী তরুণরা দ্রুত এই জুয়াভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে পরিবারে আর্থিক অস্থিরতা, ঋণগ্রস্ততা এবং সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে।
তদন্তে জানা যায়, বেশিরভাগ অনলাইন ক্যাসিনো বিদেশ ভিত্তিক সার্ভার থেকে পরিচালিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মেসেঞ্জার গ্রুপ এবং বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ করা হয়। স্থানীয় কিছু ব্যক্তি কমিশন ভিত্তিক নতুন খেলোয়াড় যুক্ত করেন। হার-জিতের টাকার লেনদেন হয় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়—মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। অনেকে হতাশা, উদ্বেগ এবং পারিবারিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছেন।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো কার্যক্রম বন্ধে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় অবৈধ ২৬০০ ওয়েবসাইট ব্লক করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অভিযানে জড়িতদের গ্রেপ্তারও করেছন।
তবে স্থানীয়দের দাবি, গ্রাম পর্যায়ে সচেতনতা ও নজরদারি আরও জোরদার না করলে এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিম্নোক্ত পদক্ষেপ জরুরি—
গ্রামভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি: স্কুল-কলেজ ও মসজিদ ভিত্তিক প্রচার কার্যক্রম চালু করা। অবৈধ অ্যাপ ও ওয়েবসাইট দ্রুত শনাক্ত ও ব্লক করা। তরুণদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।
এজেন্ট ও সংগঠকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।
পরিবারভিত্তিক পরামর্শ আসক্তদের পুনর্বাসনে কাউন্সেলিং ও সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন।
সহজে টাকা আয়ের লোভে ছেলেরা পড়াশোনা ও কাজকর্ম ছেড়ে দিচ্ছে। অনেক পরিবারে অশান্তি বাড়ছে। সমাজের বিশিষ্টজনেরা দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অনলাইন ক্যাসিনোর এই বিস্তার শুধু একটি ইউনিয়ন বা উপজেলার সমস্যা নয়—এটি জাতীয় পর্যায়ের সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে। সময়োপযোগী ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসন যদি কঠোর অবস্থান নেয়, তবে এই ক্ষতিকর প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।